ভূত চতুর্দশী। এ দিন বাঙালির ঘরে চলে এক বিশেষ রীতি— দুপুরে চোদ্দো শাক খাওয়া, সন্ধ্যায় চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানো এবং দরজায় চোদ্দো ফোঁটা দেওয়ার প্রথা। বহু প্রাচীন এই রেওয়াজকে ঘিরে নানা বিশ্বাস প্রচলিত।
লোককথায় আছে, এ রাতে মা কালীর সহচর আত্মারা নেমে আসেন মর্ত্যে। তাই অশুভ শক্তি দূর করতে প্রদীপ জ্বালানো ও চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতি চলে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এই রীতির সঙ্গে প্রকৃতির যোগ অটুট। আদ্যাশক্তি যেহেতু প্রকৃতির প্রতীক, তাই শাকের মধ্যে তাঁর শক্তির প্রকাশ। আবার পুষ্টিবিদেরা মনে করেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এতে রয়েছে গভীর স্বাস্থ্যবিজ্ঞান।
শরতের শেষে ঋতু পরিবর্তনের সময়ে নানা রোগ-জীবাণু সক্রিয় হয়। প্রাচীন কালে যখন ওষুধের অভাব ছিল, তখন এই শাকগুলির ভেষজ গুণই রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করত। চোদ্দো রকম শাকে থাকে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান, যা শরীরকে করে তোলে রোগমুক্ত ও সবল।
আগে এই দিন ছিল ঘরের মহিলাদের উৎসবের উপলক্ষ। চোদ্দো রকম শাক বাছা, কাটা আর রান্না ঘিরে চলত হাসি-আড্ডা। এখন যদিও বাজারে তেমন বৈচিত্র্য পাওয়া যায় না, তথাপি রীতিটি আজও সমানভাবে মানা হয়।
চোদ্দো শাক বলতে প্রচলিতভাবে ধরা হয়— নিম, সর্ষে, হিঞ্চে, শুষনি, বেতো, পলতা, ঘেঁটু, গুলঞ্চ, পুঁই, মেথি, পাট, পালং, লালশাক, ও কুমড়ো পাতা।
প্রত্যেকটির রয়েছে আলাদা স্বাস্থ্যগুণ—
* পালং ও পাটশাক: আয়রন ও ভিটামিনে ভরপুর, রক্তস্বল্পতা ও হজমে উপকারী।
* নিমপাতা ও বেতো: জীবাণুনাশক, ত্বক ও যকৃতের জন্য ভাল।
* লালশাক ও মেথি: ডায়াবিটিস ও হার্টের স্বাস্থ্যে সাহায্য করে।
* হিঞ্চে ও ঘেঁটুশাক: রক্তশোধন ও ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর।
* শুষনি ও গুলঞ্চ: স্নায়ু শান্ত রাখে, রক্তচাপ ও অনিদ্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এইভাবে দেখা যায়, ভূত চতুর্দশীর চোদ্দো শাক শুধুই ধর্মীয় আচার নয়, বরং প্রাচীন বাঙালির প্রকৃতিবিদ্যা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের এক নিখুঁত সমন্বয়।
Image source-Google