ধর্মতলার একুশে জুলাইয়ের সভা শুধুমাত্র শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়—তা একপ্রকার রাজনৈতিক রণকৌশলের সূচনাক্ষেত্র। প্রতিবারের মতো এবারও জনসমুদ্রের ঢেউ দেখা গেল তৃণমূল কংগ্রেসের মেগা কর্মসূচিতে। কিন্তু এবারের বার্তা আরও ধারালো, আরও প্রাসঙ্গিক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) একুশের মঞ্চ থেকে সরাসরি ছাব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের রূপরেখা সাজিয়ে দিলেন—যার কেন্দ্রে রয়েছে বাঙালি জাতিসত্তা, মাতৃভাষার মর্যাদা, এনআরসি আতঙ্ক ও কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা।
মমতা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—বাংলা ভাষার অবমাননা কোনওভাবে সহ্য করা হবে না। ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে প্রয়োজনে আবারও ভাষা আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি, এবং সেই আন্দোলনের পরিসর বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানী দিল্লিতেও পৌঁছতে পারে—এমন বার্তাও দিয়েছেন নেত্রী। এর মাধ্যমে তিনি যে বাংলা বনাম বহিরাগত ন্যারেটিভকে আরও শানিত করছেন, তা স্পষ্ট। এবং রাজনৈতিকভাবে সেটাই তৃণমূল কংগ্রেসের ২০২৬ সালের নির্বাচনী মূল চাল হয়ে উঠছে।
তবে এটি একতরফা বাঙালি জাতীয়তাবাদ নয়। বরং হিন্দিভাষী মানুষের প্রতিও বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী—বাংলায় হিন্দিভাষীরা তাঁদের মাতৃভাষায় কথা বললে কোনও সমস্যা নেই। ভাষার নামে কোনও বিদ্বেষ নয়, বরং বাঙালির আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক সত্তা রক্ষাই মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে মমতা যে বহুভাষিক ভোটব্যাঙ্ককেও বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট।
আরও একটি কৌশলী অস্ত্র হল এনআরসি ভীতি। বিহারে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের প্রেক্ষিতে রাজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সংখ্যালঘু, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। মমতা সেই ভয়কে কার্যকরভাবে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছেন। কোচবিহারের মতুয়া যুবক উত্তম ব্রজবাসীর এনআরসি নোটিশ এবং বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া রাজবংশী, মতুয়া সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার—এইসব ঘটনাকে সামনে এনে তিনি আবার নতুন করে এনআরসি আতঙ্ককে জাগিয়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি যে তৃণমূলের শক্তিশালী সামাজিক জোটকেও আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছেন, তা স্পষ্ট।
জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় রাজনীতির ময়দানে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মমতা তুলে ধরেছেন একাধিক উন্নয়নমূলক ধর্মীয় পরিকাঠামো—কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, পুরী জগন্নাথ ধাম, জল্পেশের স্কাই ওয়াক, এবার যুক্ত হচ্ছে দুর্গা অঙ্গন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য—ধর্ম বিশ্বাসের জায়গা, কিন্তু সেটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করলে তার প্রতিবাদ হবেই।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী মোদির উপরও কটাক্ষ শানিয়েছেন মমতা। ট্রাম্পের কথায় ভারত সরকার চলে, সিঁদুরে অপারেশনের নামে কাশ্মীর পুনরুদ্ধার না হওয়ার প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। একই সঙ্গে বলেছেন—টেলিপ্রম্পটার থেকে বাংলা পড়ে কেউ বাঙালি হয়ে যায় না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই মোদির ‘বাঙালিয়ানার’ দাবি যে তিনি মানতে নারাজ, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন স্পষ্টভাবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল শহিদ জওয়ান ঝন্টু আলি শেখ এবং বিতান অধিকারীর পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া। এটি শুধুমাত্র সহানুভূতির নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও শহিদদের মর্যাদা নিয়েও যে তাঁর সরকার সংবেদনশীল, সেই বার্তা দিয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ ইস্যুতেও একপ্রকার প্রতিপক্ষকে টেক্কা দেওয়ার কৌশল স্পষ্ট হয়েছে। শেষে, রাজনৈতিক ভাষণে নেতৃত্বের বার্তা ছিল অবিচল—মমতা একাই দশজনের সঙ্গে লড়ার শক্তি রাখেন, তবে কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া লড়াই অসম্পূর্ণ। তাই এবার লক্ষ্য ৪০ আসনের বেশি, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে।
তিনি ঘোষণা করেছেন—দিল্লি থেকে বিজেপিকে উৎখাত না করা পর্যন্ত শান্ত হবেন না। বাংলার ‘অস্মিতা’, ‘অধিকার’ এবং ‘অভিমান’—এই ত্র্যহস্পর্শী আবেগকে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপে রূপান্তর করাই মমতার পরবর্তী কৌশল। একুশের মঞ্চে সেই রূপরেখাই গড়ে তোলা হল।
আরও পড়ুন: Mamata Banerjee: ২১ জুলাই শহিদ দিবস ধর্মতলাতেই কেন? ইতিহাস স্মরণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়